
মতামত:
গত ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর, দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি সন্ত্রাসমুক্ত, দখলদারিত্বহীন এবং সুস্থ ধারার রাজনৈতিক পরিবেশ। তবে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতি বিকৃতির ঘটনা, যা ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এর ফলে একজন ছাত্র নেতার পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আমাদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বড়সড় এক ধাক্কা দিয়েছে।
তুচ্ছ ঘটনা থেকে নৃশংসতার বিস্তার
গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার সূচনা ঘটে একটি সামান্য বিষয় থেকে। ‘ছাত্র-রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’ শীর্ষক একটি গ্রাফিতিতে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে ‘গুপ্ত’ লিখে দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হওয়া তর্ক-বিতর্ক দুপুরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং বিকেলে বর্বরোচিত সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রশ্ন উঠছে, মত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ‘গ্রাফিতি’ যখন আক্রমণের শিকার হয়, তখন কেন আলোচনার পরিবর্তে রামদা ও তলোয়ারের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে? একটি শব্দের পরিবর্তনের জন্য একজনের পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা কি আদৌ ছাত্রসুলভ বা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সংজ্ঞায় পড়ে?
নৃশংসতা ও ভয়ের পুনরুত্থান
বিকেলে সিটি কলেজের সামনে ছাত্রশিবিরের স্থানীয় ওয়ার্ড সভাপতি আশরাফুল ইসলামের ওপর হামলা, আমাদের অতীতের অন্ধকার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। পায়ের গোড়ালি প্রায় বিচ্ছিন্ন করার মতো নির্মমতা প্রমাণ করে যে, ক্যাম্পাসে এখনো অসহিষ্ণুতা ও পেশিশক্তির রাজনীতি মজবুত অবস্থানে রয়েছে। যখন ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। এই প্রতিহিংসার সংস্কৃতি যদি অবিলম্বে বন্ধ না করা যায়, তবে ক্যাম্পাসগুলো আবারও 'টর্চার সেল' বা 'অস্ত্রের রণক্ষেত্রে' পরিণত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা
ঘটনার পর পুলিশ এবং কলেজ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও, যে গুমোট উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা শিক্ষার পরিবেশের জন্য একটি বড় হুমকি। ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবির—উভয় পক্ষই ৫ই আগস্টের পর একটি পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি কলেজের এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত প্রমাণ করছে যে, আধিপত্য বিস্তারের পুরনো নেশা রাজনৈতিক দলগুলোকে আবারও গ্রাস করছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের জন্য এটি জরুরি যে, তারা কেবল শোক বা নিন্দা জানানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না থেকে, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের উগ্রতা ও প্রতিহিংসা দমনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
বিচারহীনতা বনাম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
আমরা একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, যেখানে মেধার লড়াই হবে যুক্তির ভিত্তিতে, রামদার কোপে নয়। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের এই হামলায় জড়িতদের দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের সাহায্যে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে শাস্তির মুখোমুখি না করলে ক্যাম্পাসে বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
উপসংহার
যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিতির মতো সৃজনশীল কাজ রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে আমাদের রাজনৈতিক সহনশীলতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমরা চাই না চট্টগ্রাম সিটি কলেজ বা দেশের অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবারও রক্ত আর লাশের রাজনীতিতে কলঙ্কিত হোক। অবিলম্বে সব পক্ষকে সংযত হতে হবে এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা, এই আগুনের আঁচ পুরো দেশের ছাত্রসমাজকে গ্রাস করতে পারে।
হাদি মুহাম্মদ রাফসান
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।