
উত্তরাঞ্চলের জেলা নওগাঁয় আম বাগানের বিস্তার গত কয়েক বছরে ধানের জমি দখল করে নিয়েছে। যদিও বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ লাভজনক মনে হয়, এর আড়ালে একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট প্রমাণিত হচ্ছে। বিশেষ করে, নওগাঁর প্রান্তিক নারীরা এই পরিবর্তনের ফলে ক্রমাগত তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের স্থান হারাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি গ্রামীণ নারীদের জন্য ‘ফিনিশ’ বা নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধান ও আমের অর্থনীতির মধ্যে তফাৎ প্রথাগত ধানভিত্তিক কৃষি ছিল একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড লাইভলিহুড সাপোর্ট’ বা সমন্বিত জীবনব্যবস্থা। ধানের উপজাত যেমন—খড় ও বিচালির মাধ্যমে গবাদিপশুকে লালন-পালন করা হতো এবং তুষ ও খুদ ব্যবহৃত হতো হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল গ্রামীণ নারীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। হাঁস-মুরগি, ডিম ও দুধ বিক্রির মাধ্যমে নারীরা নগদ টাকার সরবরাহ পেতেন, যা বলা হয় নারীর ‘বাস্তব ক্ষমতা’ বা সম্পদ নিয়ন্ত্রণ।
আমের বাগানে নারীর ভূমিকা হ্রাস বিপরীতে, আম একটি একক বাণিজ্যিক ফসল, যার মালিকানা পুরুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে। ফলে, নারীর ভূমিকা এখানে গৌণ হয়ে পড়েছে। আমের বাগানে ধানের মতো কোনো উপজাত নেই, যা দিয়ে ভাতার জন্য গবাদিপশু লালন-পালন করা সম্ভব। এর ফলে, নারীদের নিজেদের আয় ও পরিবারের পুষ্টির উৎস কমে যাচ্ছে।
আদিবাসী ও প্রান্তিক নারীদের কর্মহীনতা এক সময় ধানক্ষেতে বিপুল সংখ্যক প্রান্তিক ও আদিবাসী নারী শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু আমবাগানের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। নারীদের আমবাগানের রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যে কার্যত অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। এমনকি, আদিবাসীদের জমিও বিভিন্ন কৌশলে আমবাগানের অধীনে চলে যাচ্ছে, যা তাদের স্থায়ীভাবে কর্মহীন করে তুলছে।
বাস্তুতন্ত্রের ভাঙন ও ঋণের বোঝা আমের বাণিজ্যিক বাগান ধানভিত্তিক কৃষির ঐতিহ্যবাহী বাস্তুতন্ত্র (অ্যাগ্রো-ইকোসিস্টেম) ভেঙে দিচ্ছে। গৃহবধূরা তাদের আয়ের পথ হারিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। নওগাঁর ধামইরহাট থেকে আসা এক ভুক্তভোগী নারীর মতে, "আম চাষ আমাদের ফিনিশ করে দিচ্ছে।" কারণ, অর্থের অভাবে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে পুরো পরিবার পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে।
যখন জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বড় বড় সেমিনারে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করেন, তখন নওগাঁর আমচাষের এই নেতিবাচক প্রভাবগুলো আলোচনা থেকে বাইরে থাকে। বাণিজ্যিক আম চাষের প্রসারের পাশাপাশি নারীদের বিকল্প আয়ের পথ এবং ধানের উপজাতভিত্তিক ক্ষুদ্র খামারগুলো রক্ষার উদ্যোগ না নিলে নওগাঁর নারীর ক্ষমতায়ন বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।