
মামলার ১ নম্বর আসামি হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, হাবিবুর রহমান এবং উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকেও আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ মামলায় কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ তৎপর রয়েছে।
গত বুধবার বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসমা সাদিয়া রুনা (৩৫) উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে নিহত হন। একই সময়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ফজলুর রহমানকে উদ্ধার করা হয়, যিনি বর্তমানে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। বৃহস্পতিবার আসমা সাদিয়ার মরদেহ কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগের বিভাগীয় তহবিল থেকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হওয়ার পর, পূর্ববর্তী সভাপতি শ্যাম সুন্দর সরকারের সময়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি। সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস আসমাকে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করতে চাপ দেন, তবে আসমা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য জানিয়ে অনিয়মে রাজি হননি।এর পর থেকেই আসমার সঙ্গে বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস ও শ্যাম সুন্দর সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ফজলুরসহ কয়েকজন বিভাগের অর্থ আত্মসাৎ ও অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ কারণে আসমা সাদিয়ার সঙ্গে তাদের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে এবং ফজলুর বিভিন্ন সময়ে তাকে হেনস্তা করতেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, বিভাগের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সভাপতিকে অসহযোগিতার অভিযোগে কয়েক মাস আগে ফজলুর রহমানকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর রহমান এবং ফজলুরকে সমাজকল্যাণ বিভাগে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আসমাকে চ্যালেঞ্জ জানান। অপরদিকে, অর্থ তছরুপের অভিযোগে সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকেও গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়, এরপর আসমাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ তোলা হয়েছে।
মামলার বর্ণনায় বলা হয়েছে, দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার নির্দেশনায় ফজলুর রহমান ধারালো ছুরি নিয়ে আসমার অফিসকক্ষে ঢুকে দরজা বন্ধ করে তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন।
এদিকে, চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, গুরুতর আহত ফজলুর রহমান বর্তমানে সাড়া দিচ্ছেন এবং কলম দিয়ে লিখে নিজের বক্তব্য দিতে পারছেন। পুলিশের কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, বিভাগ থেকে বদলি এবং বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘদিন একই বিভাগে কাজ করার পর হঠাৎ বদলি ও বেতন বন্ধ হওয়া তাকে হতাশ করে এবং তিনি হত্যার পরিকল্পনা করেন।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সহকর্মীর মৃত্যুতে তারা শোকাহত এবং হত্যার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। অপর শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত; যদি তিনি নিজেও জড়িত থাকেন, তবে তারও শাস্তি হওয়া উচিত।
ময়নাতদন্তে জানা গেছে, আসমা সাদিয়ার শরীরে ধারালো অস্ত্রের অন্তত ২০টির বেশি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম জানিয়েছেন, গলার নিচে গভীর আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া, বুক, পেট, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনার সময় ধস্তাধস্তি হয়েছিল।
মন্তব্য করুন
সকল মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য আসেনি। প্রথম মন্তব্যটি করুন।